For a better experience please change your browser to CHROME, FIREFOX, OPERA or Internet Explorer.
OCD: নিজের আচ্ছন্নতার সাথে যুদ্ধ

OCD: নিজের আচ্ছন্নতার সাথে যুদ্ধ

আমাদের মাঝে হয়তো অনেকেই আছেন যারা অনিচ্ছাসত্ত্বেও একই কাজ একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক বার করে থাকেন। দরজাটা ঠিকমতো বন্ধ করেছেন কিনা কিংবা মানিব্যাগটা সাথে নিয়েছেন কিনা বারবার পরীক্ষা করে দেখতে থাকেন। কোনকাজই মনমতো হয় না। সবকাজ নিখুঁত ভাবে করার জন্য সবসময় বিচলিত থাকেন। সামান্য ময়লা হাতে লাগলে বা না লাগলেও জীবাণুর ভয়ে বারবার হাত  না ধুয়ে থাকতে পারেন না। না চাইলেও নিজের আনমনেই একই কাজ বারবার করতে করতে হয়তো নিজের উপর কিছুটা বিরক্তও হয়ে পড়েছেন। কিন্তু কিছুতেই এ থেকে বের হয়ে আসতে পারছেন না। এ ধরণের অভ্যাসগুলো নির্দেশ করে আপনি OCD তে আক্রান্ত।

OCD বা Obsessive Compulsive Disorder একধরণের মানসিক সমস্যা। Obsessive Compulsive Disorder আমাদের কাছে শুচিবাই হিসেবেই বেশি পরিচিত। OCD তে আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই বিশেষ কোন কাজ বারবার করতে থাকে কিংবা কোন বিষয় নিয়ে বারবার ভাবতে থাকে অথবা বিশেষ কোন শব্দ বারবার উচ্চারণ করতে থাকে। এ ধরণের চিন্তা, ভাবনা ও শব্দকে কেন্দ্র করেই মূলত এ রোগ প্রকাশ পেতে শুরু করে। ধীরে ধীরে রোগীর মাঝে “অবসেশন” বা আচ্ছন্নতা ও “কম্পালশন” বা বাধ্যবাধকতা বাড়তে থাকে। নিজেই বুঝতে পারে না সে যা করছে কেন করছে। শুধু তাকে কাজটি করতে হবে সেটাই সে বুঝতে পারে। এক পর্যায়ে কাজটি তার কাছে বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে।

OCD এর সাধারণ লক্ষণসমূহ-

  • বারবার যেকোন জিনিস পরীক্ষা করে দেখতে থাকা
  • ‌ময়লা বা জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে থাকা 
  • ‌মনের অজান্তেই কোন শব্দ সবসময় উচ্চারণ করতে থাকা
  • ‌সব জিনিস একদম নিঁখুত হলো কিনা তা নিয়ে সবসময় চিন্তিত থাকা
  • নিজের কিংবা অন্যের ক্ষতি সম্পর্কে সর্বক্ষণ চিন্তিত থাকা
  • ‌আগ্রাসী বা অযাচিত চিন্তাভাবনায় সবসময় আচ্ছন্ন হয়ে থাকা

আক্রান্ত ব্যক্তিরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বুঝতে পারে তাদের এ ধরণের “অবসেশন” ও “কম্পালশন” গুলো কোন কারণ ছাড়াই হচ্ছে, কিন্তু তারা নিজেদেরকে কন্ট্রোল করে রাখতে পারে না। এ সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার নির্দিষ্ট কোন বয়সসীমা নেই। জীবনের যেকোন পর্যায়ে এসেই একজন মানুষ OCD তে আক্রান্ত হতে পারে।

ঠিক কি কারণে একজন মানুষ OCD তে আক্রান্ত হয় তা এখনো পুরোপুরি জানা না গেলেও আগে মনে করা হত সেরাটোনিন নামক নিউরোট্রান্সমিটার এর স্তর কমে যাওয়ার কারণে OCD হয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমানে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন ব্রেইনের বিচার ও পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রণকারী অংশ এবং শরীরের বিভিন্ন অংশ নাড়াচাড়া করার নিয়ন্ত্রণকারী অংশের মধ্যে ভারসাম্য ঠিক না থাকার কারণে OCD হয়ে থাকে।

OCD হওয়ার ক্ষেত্রে আরো কিছু ফ্যাক্টর কাজ করে থাকে, যেমন- বাল্যকালে শারীরিক কিংবা যৌন নির্যাতনের শিকার এখানে একটি বড় ফ্যাক্টর। এছাড়াও বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধির আক্রমণও পরবর্তীতে OCD তে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। সন্তান জন্মদানের পর অনেক ক্ষেত্রে মায়েদের মাঝেও OCD দেখা যায়।

শুচিবাইগ্রস্ততা একজন ব্যক্তির সাধারণ জীবন যাপনকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করে। আক্রান্ত ব্যক্তির মাঝে সামাজিকতা নিয়ে আতংক কাজ করে। ফলে মানুষের সাথে স্বাধীনভাবে মিশতে পারে না, সামাজিক কোন অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারে না। যার কারণে অনেক সময়ই সমাজ তাকে ভুল বুঝতে থাকে। তখন তাকে একাকীত্বকে বরণ করে নিতে হয়। এধরণের একাকীত্ব আক্রান্ত ব্যক্তির মানসিক ও শারীরিক অবস্থাকে আরো খারাপের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

আমাদের সমাজে OCD নিয়ে অনেক ভুল ধারণা আছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানুষ মনে করে যে আক্রান্ত ব্যক্তি আসলে পরিচ্ছন্নতা নিয়ে একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করছে। কিন্তু ব্যাপারটা আসলে তা নয়। OCD তে আক্রান্ত হওয়া বা না হওয়া ব্যক্তির কন্ট্রোলে থাকে না। অনেক সময় অনেকে বুঝতেও পারে না সে OCD তে আক্রান্ত। বর্তমানে দেখা যায় অনেকেই এই OCD টার্মটি জানলেও, এ সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা না থাকায়, কারণে অকারণে নিজেদের কিংবা অন্যের আচরণের সাথে OCD কে মিলিয়ে ফেলে। যার ফলে প্রকৃত অর্থেই যারা OCD তে আক্রান্ত থাকে তারা নিজেদের নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে এবং কোনরকম সাহায্য কিংবা চিকিৎসা নিতে দ্বিধাবোধ করে।

OCD যেহেতু একটি মানসিক সমস্যা তাই অন্যসব মানসিক সমস্যার মতই সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে OCD থেকেও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবন যাপনে ফিরে আসা সম্ভব। বর্তমানে চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নয়নের ফলে জটিল এ মানসিক সমস্যার  যথেষ্ট ভালো চিকিৎসার সুযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ প্রয়োগ ও বিভিন্ন সাইকোথেরাপির মাধ্যমে এখন এ মানসিক রোগ থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব হচ্ছে। আক্রান্ত ব্যক্তির পরিবার পরিজন, বন্ধু ও আশেপাশের মানুষের অনুপ্রেরণাও সুস্থ্য স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে অনেক বড় ভূমিকা পালন করে।

তবে চিকিৎসার পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তির নিজের ওপর বিশ্বাস এক্ষেত্রে খুবই জরুরী। নিজের আচ্ছন্নতা ও বাধ্যবাধকতার সাথে এ যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য সবার আগে তাই প্রয়োজন নিজের ওপর আস্থা ও ভরসা রাখা।

leave your comment