For a better experience please change your browser to CHROME, FIREFOX, OPERA or Internet Explorer.
 উবারের উৎপত্তি কথন

 উবারের উৎপত্তি কথন

 

 

বর্তমানে কর্মব্যস্ত শহরে নিজেদের গাড়ি নেই এমন মানুষদের জন্যে ভ্রমণ কিংবা দূরবর্তী জায়গায় যাতায়াত করাটা যে কতটা কষ্টের তা বলে বোঝানোর হয়তো দরকার নেই। তাছাড়া গণপরিবহনে  যাতায়াতে হরহামেশাই নিজের গোপণীয়তা হচ্ছে ঝুঁকির সম্মুখীন। শুধু তাই নয়, সঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌছানো যেমন ব্যাহত হচ্ছে ঠিক তেমনি চাইলেই গাড়ি যে পাওয়া যাবে এর কোনো নিশ্চয়তাও কেউ দিতে পারে না। এ সকল সমস্যার প্রতিকার হিসেবে কর্মব্যস্ত আর বড় শহরগুলোতে আজ আমরা ট্যক্সি-ক্যাব ধারণা লাভ করেছি, এবং সমস্যার সমাধান হিসেবে তার ব্যবহার করছি। 

 

কিন্তু এখানেও দেখা যায় যে অনেক সমস্যাই বিদ্যমান। কেউ নিজের মত করে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা এ ব্যবস্থা, খালি ট্যাক্সি না পেলে অনেকক্ষণ ধরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকাটাও সময়ের অপচয় ছাড়া কিছুই নয়। সাথে ভয় থাকে নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছে গুরুত্বপূর্ণ কাজ টা করতে পারা কিংবা না পারার অনিশ্চয়তা। যাবতীয় এসব সমস্যা মাথায় রেখেই এবং যতটা সম্ভব এগুলোর সমাধান করার মডেল বানিয়েই উবার সবার সামনে আশীর্বাদ হিসেবেই দৃশ্যমান হয়। এ সমস্যাগুলোর সমাধানে তারা পরিপূর্ণ ব্যাসায়িক মডেল দাড় করিয়েছে যা বর্তমানে গড়েছে ৭২ মিলিয়ন ডলারের এক বিশাল সাম্রাজ্য।

 

 

 

ধারণা গ্রহণ:

উপরে আলোচ্য সমস্যা গুলো থেকেই উবারের ধারণা ও উপলব্ধি প্রথম যার মাথায় আসে তিনি হলেন কানাডিয়ান উদ্যোক্তা গ্যারেট ক্যাম্প। তিনি ৭৫ মিলিয়নে তার কোম্পানি ডিস্কভারি ইঞ্জিন “স্ট্যাবলআপন” ওয়েবসাইটটি ইবে’র কাছে বিক্রি করে দেন। আর অবসরে বের হন সান ফ্রান্সিসকোতে। 

 

 

 

একদিন নিজ ঘরে বসে জেমস বন্ড সিরিজের “রয়্যাল ক্যাসিনো” মুভিটি দেখছিলেন, যেখানে তিনি এক দৃশ্যে দেখেন গাড়িতে থাকা অবস্থায় মোবাইলের মাধ্যমে গ্রাফিকাল আইকন বন্ডের বর্তমান অবস্থার সাথে সাথে তার গন্তব্যও নির্দেশ করে। বর্তমানে এ ব্যবস্থা অনেক উন্নত হলেও তখনকার সময়ে কম্পিউটার পোগ্রামার, উদ্ভাবনী মস্তিষ্কের ক্যাম্প এর কাছে খুব চমকপ্রদ আইডিয়া হিসেবে ধরা দেয় যেটাই উবারে ব্যবহারের আগ পর্যন্ত নিজের মাথায় নিয়ে ঘুরেন।

 

 

সমস্যার পূর্ণ উপলব্ধি:

২০১৭ সালের মে মাসে ইবে’র কাছে কোম্পানি হস্তগত হওয়ার পর ক্যাম্প মার্সিডিজ বেঞ্জ সি-ক্লাস স্পোর্টস কার কিনলেও রাস্তার দুর্দশার কারণে সেটা নিয়ে তেমন একটা বের হতেন না। তাই সে তার ভ্রমণের জন্যে ট্যাক্সির উপরেই নির্ভর করতেন এবং কিছু ট্যাক্সির চালকের নাম্বার টুকে নিলেন নিজের প্রয়োজনে ফোন দিয়ে ডাকার জন্যে। কিন্তু সেক্ষেত্রে তাকে নূণ্যতম এক ঘন্টা আগে ড্রাইভারকে ফোন দিয়ে জানাতে হতো এবং পরবর্তীতে এটা খুব সময় আর ব্যয় সাপেক্ষ ব্যাপার হিসেবে প্রকাশ পেলো। এছাড়া অনেক সময় দেখা যেত অন্য প্যাসেঞ্জার পেয়ে অনেক ড্রাইভার তার কথা ভুলেই যেতেন।

 

 

 

উল্লেখ্য যে, সে সময় ক্যাম্প টিভি প্রডিউসার মেলোডি ক্লোজকির প্রেমে পরেন। ক্লোজকির বাসা স্পেসেফিক হাইটস এ হওয়ায় রাত্রীকালীন তাদের দেখা-সাক্ষাৎ হওয়াটা খুব কষ্টসাধ্য ছিল, বরং হোতই না বলা যায়।

রাস্তায় সে সময় জিপসিদের ক্যাব চলাচল করতো। রাস্তায় কালো সেডান এর হেডলাইট জ্বালিয়ে তারা যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে ডাকতেন। কিন্তু নম্বর প্লেটহীন গাড়ি হওয়ায় সাধারণ মানুষেরা নিরাপত্তার অভাব বোধ করায় তাদের এড়িয়ে চলতেন। ক্যাম্প এই জিপসি ক্যাব এ চলাচল শুরু করেন এবং ড্রাইভারদের অত্যন্ত বন্ধুভাবাপন্ন ভালো মানুষ হিসেবে আবিষ্কার করেন। ১০-১৫ জনের নাম্বার সংগ্রহ করে তাদের থেকে ভালো সার্ভিস পাওয়া শুরু করেন এবং প্রাথমিক ভাবে সমস্যার সমাধান পান।

কিন্তু তখনও তিনি সহজ ও কার্যকরী পদ্ধতির অনুসন্ধান করছিলেন। ফ্রান্সিসকো সহ সারা পৃথিবীর মানুষ যে প্রতিনিয়ত এ সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন তিনি তার পূর্ণ উপলব্ধি করেন। তার চিন্তা জগত থেকে কার্যকরী বুদ্ধির বিকাশ এই সারা বিশ্ব পরবর্তীতে উবারের রূপে দেখতে পান।

 

উবারক্যাবের যাত্রা:

 

ক্যাসিনো রয়্যাল থেকে পাওয়া সেই  অ্যাপ্লিকেশন মডেলটির ধারণা আর সে সময়ের আইফোনের এক্সেলেরোমিটারের সুবিধা যার ফলে জিপিএস অন করে নিজের অবস্থানের পরিবর্তন ম্যাপে দেখা যায়; এ দুই এর সংমিশ্রণে নতুন অ্যাপ তৈরী করা যে সম্ভব ক্যাম্প তা বুঝতে পারেন। ক্যাম্প প্রাথমিকভাবে সান ফ্রান্সিনসকোতে পরীক্ষামূলক ভাবে এ কাজ শুরু করেন। নিজের গাঁটের টাকা খরচ করে পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হিসেবে নভেম্বরের শেষ দিকে সীমিত দায়ের কোম্পানি হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়ায় “UberCab” এর রেজিষ্ট্রেশন সম্পন্ন করেন। এবং ২০০৯ এর জানুয়ারিতে ৫টি নতুন গাড়ি নিয়ে কোম্পানির যাত্রা শুরুর ঘোষণা দেয়া হয়। 

 

 

 

ক্যাম্প তার এ পরিকল্পনা শোনানোর পাশাপাশি তার বন্ধু অস্কারকে অ্যাপ্লিকেশনের জন্যে তৈরী মক-অ্যাপটি দেখান। অস্কার ছিলেন ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার। অস্কার এর বেশ পছন্দ হয় আইডিয়াটি। পরিকল্পনা অনুযায়ী উবারক্যাব অ্যাপ্লিকেশনটির প্রোটোটাইপ ডেভলপমেমট এর কাজ অস্কারের দায়িত্বে দিয়ে ক্যাম্প প্যারিসের উদ্দেশ্যে রওনা হন।

 

 

 

২০০৮ সালের ডিসেম্বরে আইডিয়াটি প্রস্তাবনের জন্যে বান্ধবী মেলোডির সাথে ক্যাম্প প্যারিসে লে-ওয়েব ইভেন্ট এ যোগ দেন। সেখানে Red Swoosh এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা কালানিক এর সাথে ক্যাম্প এর পরিচয় হয়। কিছুদিন ধরে ক্যাম্প তাকে আইডিয়াটি শোনান তবে AirBnB এর মত বড় আইডিয়া নিয়ে কাজ করায় তিনি ক্যাম্প এর সাথে পুরোপুরি যোগ না দিয়ে সহযোগিতার কথা ভাবেন। কিন্তু এরপর একটা ঘটনা কালানিক কে এই আইডিয়াকে আরও বিশাল আকারে প্রকাশ লাভ করাতে উদ্ভুদ্ধ করে।

 

 

 

একদিন মেলোডি, ক্যাম্প, কালানিক রাতে হোটেল ফেরার সময় ক্যাব নেন। তারা উৎফুল্ল হয়ে জোরে কথা বলছিলেন আর মেলোডি তার লম্বা পায়ের আরামের জন্যে তা সামনের দুই সিট এর তাকিয়ায় রাখেন। ড্রাইভার ফ্রেঞ্চে তাদের রাগে-জোরে কিছু কথা বলেন। মেলোডি অনুবাদ করে বলেন, ” ড্রাইভার বলেছেন আমরা যদি জোরে কথা বলি আর পা যদি না নামাই তাহলে এক্ষুনি আমাদের ক্যাব থেকে নামিয়ে দেবেন। ” কালানিক এতে প্রচন্ড অপমানিত ও ক্ষিপ্ত হন। তৎক্ষণাত ক্যাব থেকে তারা নেমে যান এবং পরে অনেকক্ষণ তুষারের মাঝে প্যারিসের রাস্তায় তাদের দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। 

 

 

এরপর পর ই কালানিক সিদ্ধান্ত নেন ক্যাম্প এর সাথে পুরোপুরি থাকবেন এবং শুধু কয়েকটা মার্সিডিজ রাস্তায় নামিয়ে ছোট পরিসরে এটা না করে বরং AirBnB এর মত অ্যাপ্লিকেশনটি সবার মাঝে উন্মুক্ত করে দিতে বলেন। ক্যাম্প এরও এই আইডিয়া বেশ পছন্দ হয়। মূলত এ আইডিয়াই উবারের মূলভিত্তি যা বর্তমানে বিলিয়ন ডলারের কম্পানি গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

 

 

উবারক্যাবের সূচনা কার্যক্রম:

স্ট্যাবলআপনের সিইও থাকা অবস্থায় সাইট প্রজেক্ট হিসেবে ২০০৯ এ উবারক্যাবের কাজ শুরু হয়। ৩ টি গাড়ি নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে ২০১০ এ যাত্রা শুরু করে সান ফ্রান্সিসকোতে এবং পরিপূর্ণ কোম্পানির রূপ পায়। 

 

প্রথমে উবারক্যাব “উবারব্ল্যাক” নামে এক সার্ভিসের আওতায় ছিল। উবার ক্যাবের মালিকানাধীন গাড়ি না থাকলেও সেখানে নিবন্ধিত ব্ল্যাক সেডানগুলো অ্যাপের মাধ্যমে যে কেউ ভাড়া নিতে পারতো। 

 

আগস্টে জেনারেল ম্যানেজার রায়ান গ্রেবসকে চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসারের দায়িত্ব দেয়া হয়। ডিসেম্বরে তাকে সিইও পদে স্থানান্তর করে ট্রাভিস কালানিক কে গুরুত্বপূর্ণ পদটায় বসানো হয়। কালানিক এর পদত্যাগের পর ২০১৭ তে ইরানি বংশোদ্ভূত খসরোশাহী উবারের সিইও এর পদে আসীন হন। 

 

উবারক্যাব থেকে উবার:

সান ফ্রান্সিসকোর পৌর পরিবহন সংস্থা থেকে ২০১০ এর অক্টোবরের দিকে উবারক্যাবের নাম পরিবর্তন করার জন্যে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়। কেননা স্থানীয় গ্রাহকরা উবারক্যাবের পরিবর্তে শুধু ক্যাব শব্দ ব্যবহার করছে যা প্রচলিত ক্যাবের সাথে সাংঘর্ষিক। তাই নোটিশের পর পর ই কোম্পানি উবারক্যাব থেকে উবার এ নাম স্থানান্তরিত করে ফেলে এবং ইউনিভার্সাল মিউজিক গ্রুপ থেকে Uber.com ডোমেইনটি কিনে নেয়।

 

শুরুর পর থেকেই নানাবিধ সমস্যায় পরতে হয়েছে উবার কে। সমসাময়িক Lyft এর সাথে প্রতিদ্বন্দিতা, ট্যাক্সি ইন্ড্রাস্ট্রির ক্ষোভের মুখে পরা, লন্ডনে লাইসেন্স বাতিল হওয়া, বিভিন্ন সময়ে ভাড়ার তারতম্যের কারণে যাত্রী অসন্তুষ্টি, তাদের বিরুদ্ধে গুগুলের স্ব-নিয়ন্ত্রিত গাড়ির ডকুমেন্ট হাতানোর অভিযোগের পক্ষে ২৪৫ মিলিয়ন এর মত বিশাল অংকের জরিমানার সম্মুখীন হওয়া উবার কিন্তু এখনও থেমে যায়নি। সব বাঁধা-বিপত্তি পাশ কাটিয়ে উবার পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়েছে তাদের শাখা। অর্জন করেছেন লাখো-কোটি মানুষের আস্থা। শুধু উবারেই ক্ষান্ত না থেকে উবার ইটস তৈরী করেছে যা মানুষকে ডেলিভারি চার্জের মাধ্যমে বাসায় বাসায় গিয়ে খাবার পৌঁছিয়ে দেয়ার মত সুবিধা দিচ্ছে এবং বেশ জনপ্রিয়তা কামিয়েছে। 

 

বর্তমানে উবার উড়ন্ত গাড়ির সার্ভিস চালু করার মত বিশাল সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্যে পায়তারা করছে। তবে এর জন্যে অনেক সময়ের অপেক্ষা প্রয়োজন সায়েন্স ফিকশনকে বাস্তবে রূপ দিতে। তারা নিজেদের হস্তগত বোয়িং কো’র মত সমৃদ্ধ এয়ারক্রাফট প্রস্তুতকারক কোম্পানির মত আরও ৪ টি কোম্পনির সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে। তবে নিজেরা এয়ারক্রাফট তৈরীর দিকে না গিয়ে অন্যান্য কোম্পানিগুলোর কোলাবরেশনে সেবা ছড়িয়ে দিতে বেশি আগ্রহী। 

 

উবারের জনপ্রিয়তা তাই আজ আকাশচুম্বী। বাংলাদেশেও উবার তাদের সার্ভিস এর জন্যে প্রশংসায় ভাসছে। 

 

This post is written by Akash Manzur.

 

 

leave your comment