For a better experience please change your browser to CHROME, FIREFOX, OPERA or Internet Explorer.
করোনা ভাইরাসে মিলতে পারে সাফল্য,প্রশংসার দাবিদার সিঙ্গাপুর এবং দক্ষিন কোরিয়া

করোনা ভাইরাসে মিলতে পারে সাফল্য,প্রশংসার দাবিদার সিঙ্গাপুর এবং দক্ষিন কোরিয়া

 

 

 

পশ্চিমের দেশগুলোয় ঊর্ধ্বগতিতে বেড়ে চলেছে করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। এশিয়া (চীনের উহান শহর) থেকে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়লেও এশিয়ার দেশগুলোর চেয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর পরিস্থিতি গুরুতর। তবে বিস্তার থেমে নেই এশিয়াতেও। এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশ প্রধান প্রধান শহর অবরুদ্ধ করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার মতো বড় বড় পদক্ষেপ নিয়েছে।

 

 

 

কয়েক সপ্তাহ আগে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ভাইরাসটি আঘাত হানে। তবে কিছু দেশ কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে ভাইরাসটির বিস্তৃতি নিয়ন্ত্রণ করে প্রশংসা কুড়িয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় সিঙ্গাপুর, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের কথা। চীনের কাছাকাছি থেকেও তারা ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষে সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম রাখতে পেরেছে। তারা আসলে ব্যতিক্রম কী করেছে, যা অন্য দেশগুলোর জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে?

 

 

সারা বিশ্বে মহামারী হিসেবে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ১৫লাখের  বেশি মানুষ। মৃতের সংখ্যা ৮৮ হাজার এরও বেশি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস মোকাবিলায় তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। ইতালিতে যেমন ১০ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, তেমনি হংকং, ম্যাকাও, ভিয়েতনাম, রাশিয়া, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো করোনা মোকাবিলায় দেখিয়েছে দারুণ সাফল্যও। এমনকি উৎপত্তিস্থল চীনই এখন করোনা নিয়ন্ত্রণের রোল মডেল।

 

সফল দেশ এবং শহর হিসেবে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন করেছে সিঙ্গাপুর এবং দক্ষিন কোরিয়া।

 

 

চিকিৎসায় মিলেছে সাফল্য-সিঙ্গাপুর

 

সাধারণভাবেই চিকিৎসার জন্য সারা বিশ্বে নামডাক আছে সিঙ্গাপুরের। করোনাভাইরাস মহামারীর কবল থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারেনি তারাও। তবে এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় দারুণ সাফল্য দেখিয়েছে সিঙ্গাপুর। কভিড-১৯ চিকিৎসায় এখন পর্যন্ত এ রোগের সুনির্দিষ্ট প্রতিষেধক না থাকলেও দেশটিতে করোনা আক্রান্তদের মধ্যে অর্ধেকই সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেছেন। ৪৫৫ জনের মধ্যে ১৪৪ জনই সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেছেন। মৃত্যু হয়েছে মাত্র দুজনের। আরও ৩০৯ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। এ ছাড়া আইসিইউতে আছেন আরও ১৪ জন। সিঙ্গাপুরের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে দেশটিতে সন্দেহজনক প্রায় দেড় হাজারেরও বেশি মানুষকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। করোনা আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা আরও প্রায় ৩ হাজার জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়া কোয়ারেন্টাইনের মেয়াদ পূর্ণ করেছেন অন্তত দুই হাজার মানুষ। এসব করেই সিঙ্গাপুর করোনা মোকাবিলায় সফল হয়েছে।

 

 

 

 

সচেতনতা দিয়েছে তাদের সাফল্য-দক্ষিন কোরিয়া

 

 

 

সারা বিশ্বের মতো দক্ষিণ কোরিয়ায়ও ভয়ঙ্করভাবে ছড়িয়ে পড়ে করোনাভাইরাস।দিনে ছয়-সাতশ মানুষও আক্রান্ত হয়েছে সেখানে। কিন্তু কয়েকদিনের ব্যবধানেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে তারা। শহর বা দেশ অবরুদ্ধ করে নয়, এর বদলে কোরীয় কর্তৃপক্ষ ভাইরাস আক্রান্ত বা সন্দেহজনক ব্যক্তিদের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে থাকার নিয়ম করেছে। এ ছাড়া জনগণকে যথাসম্ভব ভিড় এড়িয়ে চলা, অনুষ্ঠান পরিহার, মাস্ক পরিধান এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বিমান যোগাযোগ বন্ধ না করে সিউল যাত্রীদের জন্য বিমানবন্দরে বিশেষ ব্যবস্থা চালু করেছে। সেখানে যাত্রীদের শারীরিক তাপমাত্রা পরীক্ষা, খুঁটিনাটি ভ্রমণ তথ্য, স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিস্তারিত প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে। গত জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত অন্তত আড়াই লাখ মানুষের শারীরিক পরীক্ষা করেছেন দক্ষিণ কোরিয়ার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। দেশটিতে প্রতিদিন অন্তত ১৫ হাজার মানুষের করোনা টেস্ট করা হচ্ছে। সন্দেহভাজন করোনা রোগীদের মেডিকেল টেস্ট সম্পূর্ণ ফ্রি করে দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। চিকিৎসকরা রেফার্ড করলে সন্দেহভাজন রোগীরা বিনামূল্যেই টেস্ট করাতে পারছেন। দেশটির শতাধিক হাসপাতাল-ক্লিনিকের পাশাপাশি করোনাভাইরাস টেস্টে প্রায় অর্ধশত ভ্রাম্যমাণ ল্যাবরেটরিও কাজ করছে। নাগরিকদের সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করে সহজেই ভাইরাস সংক্রমণের উৎস নির্ধারণ, আক্রান্ত বা সন্দেহভাজনদের চিকিৎসা ও কোয়ারেন্টাইনে রাখার ব্যবস্থা করছে দক্ষিণ কোরিয়া কর্তৃপক্ষ। এসব তথ্য ব্যবহার করেই করোনা সংক্রমণের হার আশ্চর্যজনকভাবে কমিয়ে এনেছে দক্ষিণ কোরিয়া। সেখানে মৃত্যুহারও অন্যান্য দেশের চেয়ে অনেক কম। ইতালিতে করোনা আক্রান্তদের মৃত্যুহার যেখানে ১০ শতাংশ, সেখানে দক্ষিণ কোরিয়ায় মৃত্যুহার ০.৮ শতাংশ মাত্র।

 

 

 

এছাড়া আরো অন্যান্য পদক্ষেপ গ্রহনের মাধ্যমেও তারা দেখিয়েছে সাফল্য যা অন্য দেশের করোনা মোকাবেলায় হতে পারে রোল মডেল।

 

 

পদক্ষেপ ১: গুরত্ব সহকারে প্রাদুর্ভাবটি উপলব্ধি করুন এবং দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহন করুন

 

 

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা প্রাদুর্ভাবটি নিয়ন্ত্রণে কিছু বিষয়ে একই পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে সম্মতি প্রকাশ করেছেন। আর তা হচ্ছে ব্যাপকভাবে পরীক্ষা করুন, আক্রান্ত ব্যক্তিদের আলাদা রাখুন এবং সামাজিক মেলামেশাকে নিরুৎসাহিত করুন। এই পদক্ষেপগুলো পশ্চিমা দেশগুলো গ্রহণ করেছে। তবে মূল তফাতটা হচ্ছে অনেক দেশ যত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল, তা নেয়নি।

 

 

এ ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা নীতিবিষয়ক সাবেক পরিচালক তিক্কি প্যানগেস্তো বলেছেন, ‘যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র সুযোগ হারিয়েছে। চীনে ভাইরাসটি ছড়ানোর পর তারা দুই মাস সময় পেয়েছিল। অথচ তারা এমন একটি ভুল ধারণা পোষণ করে ছিল যে চীন তো অনেক দূরে এবং কিছুই হবে না।’ একই ভুল আরও অনেক দেশই করছে।

 

 

গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর চীনে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসটি সম্পর্কে জানতে পারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তখন ভাইরাসটিকে রহস্যজনক উল্লেখ করে বলা হচ্ছিল, এটা সার্সের মতো আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে নিউমোনিয়া ঘটাতে পারে। ওই সময় ভাইরাসটি মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে না বলে মনে করা হয়েছিল। ভাইরাসটি সম্পর্কে খুব কমই জানা গিয়েছিল। কিন্তু ওই অবস্থাতেও তিন দিনের মধ্যে সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান ও হংকং তাদের সীমান্তে স্ক্রিনিং শুরু করে। তাইওয়ান উহান থেকে আসা যাত্রীদের পরীক্ষা করা শুরু করে।

 

 

ভাইরাসটি সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা যখন আরও জানতে শুরু করলেন, তখন জানা গেল, উপসর্গ নেই  এমন ব্যক্তিরাও সংক্রমিত হতে পারে। ফলে পরীক্ষা করা এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

 

 

পদক্ষেপ-২: পরীক্ষাগুলোকে সাশ্রয়ী করে ব্যাপকভাবে পরীক্ষার সংখ্যা বাড়াতে হবে

 

দক্ষিণ কোরিয়ায় শুরুতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছিল। তবে তারা কোনো ব্যক্তি ভাইরাসে আক্রান্ত কি না, সে পরীক্ষা শুরু করে ব্যাপকভাবে। এখন পর্যন্ত দেশটি ২ লাখ ৯০ হাজার মানুষকে পরীক্ষা করে ফেলেছে। প্রতিদিন দেশটি বিনা মূল্যে ১৫ হাজার লোকের পরীক্ষা করছে।

 

 

 

 

এ ব্যাপারে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের সংক্রামক রোগের উদ্ভব বিষয়ের অধ্যাপক ওই ইং ইয়ং বলেছেন, তারা (দক্ষিণ কোরিয়া) যেভাবে পদক্ষেপ নিয়েছে এবং লোকজনকে পরীক্ষা করেছে, তা উল্লেখ করার মতো।

 

 

সংক্রামক ব্যাধির পরীক্ষার ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ায় যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়ার দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া রয়েছে। ২০১৫ সালে মিডল ইস্ট রেসপিরেটরি সিনড্রোম প্রাদুর্ভাবে দেশটির ৩৫ জন মারা যাওয়ার পর তারা এই দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া কার্যকর করে।

 

 

 

অধ্যাপক প্যানগেস্তো জানান, কিছু দেশে পরীক্ষার জন্য যথেষ্ট কিট নেই। তিনি বলেন, ব্যাপকভাবে পরীক্ষা করার বিষয়টি এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পেতে হবে। উপসর্গ রয়েছে, কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন হয়নি এবং এখনো ভাইরাস ছড়াচ্ছেন, এমন ব্যক্তিদের পরীক্ষা করা আরও বেশি জরুরি।

 

পদক্ষেপ-৩: শনাক্ত ও পৃথক করুন 

 

যাদের উপসর্গ রয়েছে, শুধু তাদের পরীক্ষা করাই যথেষ্ট নয়। ওই ব্যক্তির সংস্পর্শে কারা কারা এসেছে, তাদের শনাক্ত করুন। সিঙ্গাপুরে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে সংস্পর্শে আসা এমন ছয় হাজারের বেশি ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছিল। তাদের পরীক্ষা করা হয় এবং সেলফ আইসোলেশনে (বাড়িতে আলাদা থাকা) থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়, যতক্ষণ না পরীক্ষার ফল নেগেটিভ আসে।

 

 

সিঙ্গাপুরে কোয়ারেন্টিন বা সেলফ আইসোলেশনে থাকা ব্যক্তিদের দিনে কয়েকবার করে কর্তৃপক্ষকে ছবি পাঠিয়ে তার অবস্থা সম্পর্কে জানাতে হয়েছে। দেশটিতে নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কারাদণ্ডসহ নানা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পশ্চিমা অনেক দেশ এসব ব্যবস্থা নিতে পারেনি তাদের বিপুল জনসংখ্যা এবং উদার নাগরিক অধিকারের কারণে।

 

 

এ ব্যাপারে অধ্যাপক ওই বলেছেন, ‘আমরা সংখ্যায় কম বলে তা (ওই সব পদক্ষেপ) করতে পেরেছি। আমরা যা যা করেছি, তার সবই হুবহু অনুকরণের কোনো মানে নেই। প্রতিটি দেশকে তার উপযোগী ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

পদক্ষেপ-৪: সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখুন

 

করোনাভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া রোধে সামাজিক মেলামেশা বন্ধ রেখে দূরত্ব বজায় রাখা অন্যতম কার্যকর একটি উপায়। চীনের উহান থেকে এই ভাইরাসের যাত্রা শুরু। সেখানে শাটডাউনের আগে ৫০ লাখ মানুষ উহান ছেড়ে যায়। এর ফলে চীন সরকার মানব–ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কোয়ারেন্টিন ব্যবস্থা কার্যকর করে।

 

 

তবে সিঙ্গাপুরে গণজমায়েত নিষিদ্ধ হলেও স্কুলগুলো চালু আছে।

 

 

ওই অধ্যাপক মনে করেন, সরকার কত দ্রুত সামাজিক মেলামেশা বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারবে, তার ওপর করোনাভাইরাস রোধের সাফল্যের রকমফের হবে। তাঁর ভাষায়, অনেক দেশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার হার এত বেশি যে দ্রুত আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

 

 

গণজমায়েত নিষিদ্ধ বা স্কুল বন্ধ করে সামাজিক মেলামেশা বন্ধের বিষয়টি সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। তবে জনগণ কতটা সানন্দে এই উদ্যোগে অংশ নেয়, সেটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্যই ব্যক্তিগত আচরণ, জনগণের সমষ্টিগত আচরণ এই দুর্যোগে গুরুত্বপূর্ণ।

 

পদক্ষেপ-৫: জনগণকে ভালোভাবে অবহিত করুন এবং পাশে থাকুন

 

 

অধ্যাপক প্যানগেস্তো বলেছেন, জনগণের কাছ থেকে সহযোগিতা না পেলে সরকারের কর্মকৌশল কোনো কাজে আসবে না। বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে যে কর্মকৌশল ঠিক করা হয়েছে, জনগণকে তা দেখানো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে তিনি মনে করেন।

 

 

করোনাভাইরাস যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে—চীন সেটি স্বীকার করতে দেরি করায় সমালোচনার মুখে পড়ে। দ্রুত ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার উদ্বেগের মধ্যেও সরকার উহানে বড় ধরনের রাজনৈতিক সমাবেশের অনুমতি দেয়। যেসব চিকিৎসক অন্যদের সতর্ক করেছেন, তাঁদের শাস্তি দিয়েছে। ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ব্যাপক মৃত্যুর ঘটনার পর খবরটি ছড়িয়ে পড়ে।

 

 

পরে অবশ্য চীন বড় আকারে লকডাউন করে এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার জন্য দ্রুত হাসপাতালের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করে। এর ফলে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার হার ও মৃত্যুর সংখ্যা কমে। চীনের এই উদ্যোগ বিশ্বের প্রশংসা কুড়িয়েছে। তবে এটাও মনে রাখা দরকার, প্রাথমিক পর্যায়ে যদি চীন দ্রুত উদ্যোগী হতো, তাহলে পরবর্তী সময়ে হয়তো তাদের এত কঠোর পদক্ষেপ নিতে হতো না।

 

 

অধ্যাপক ওই বলেন, দুর্যোগে সাড়া দেওয়ার বিষয়টি স্বচ্ছ হতে হবে, যাতে মানুষ আতঙ্কিত হওয়ার বদলে আশ্বস্ত হতে পারে।

 

 

করোনাভাইরাসের বিস্তার মোকাবিলায় সিঙ্গাপুরের পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হচ্ছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী দুর্যোগকালে জাতির উদ্দেশে বক্তব্য দিয়েছেন। ফলে, আতঙ্কিত হয়ে কেনাকাটার হিড়িক বন্ধ হয়েছে। জনগণ সরকারের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। গণমাধ্যমও সহযোগিতামূলক ভূমিকা পালন করছে।

 

 

 

এশিয়ার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মাস্ক পরা তত কার্যকর নয়। বরং বারবার হাত ধুয়ে বেশি ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে। তবে মাস্ক পরা কার্যকর, নাকি কার্যকর নয়, তা নিয়ে এখনো বিতর্ক আছে।

 

 

ইউনিভার্সিটি অব হংকংয়ের মহামারিবিষয়ক অধ্যাপক বেঞ্জামিন কাউলিংয়ের ভাষ্য, করোনাভাইরাস মোকাবিলায় মাস্ক পরা জাদুকরি কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না। প্রত্যেকেই যদি হাত ধোয়া, সামাজিক মেলামেশা বন্ধ রাখার পাশাপাশি মাস্ক পরে, তাহলে হয়তো এটা কাজে দিতে পারে। বাকি সাবধানতাগুলো না মেনে শুধু মাস্ক পরে এই রোগের বিস্তার ঠেকানো যাবে না।

 

 

এরপরও প্রশ্ন থাকে। ওপরে যা যা বলা হয়েছে, তা মেনে চললে কি ভাইরাসটিকে থামানো যাবে? বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশগুলো যত বেশি আগ্রাসী পদক্ষেপ নেবে, ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার হারও তত কমে আসবে। এরপরও চোখ রাখতে হবে যেসব দেশ করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে, তাদের পরবর্তী অবস্থা এখন কেমন। যেমন সীমান্ত দিয়ে ফেরা লোকজনের কারণে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর ও হংকং এখন দ্বিতীয়বারের মতো করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার হুমকির মুখে পড়েছে। এটা এখনো স্পষ্ট নয় যে মহামারিটি কত দিন চলবে।

 

 

অধ্যাপক ওই আশাবাদী যে চীনের হুবেই প্রদেশ লকডাউন (অবরুদ্ধ) করে দেওয়ার দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা কমতে শুরু করে। যদিও চীনের লকডাউন পরিস্থিতি ছিল খুবই কঠোর, এরপরও তুলনামূলক শিথিল লকডাউন ব্যবস্থা নেওয়া দেশগুলোও ভাইরাসটিকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। তাঁর ভাষায়, এখন অন্য দেশগুলোর জন্য ওই লকডাউন ব্যবস্থা অনুপ্রেরণা হওয়া উচিত। এটা কষ্টকর কিন্তু করতে হবে।

 

 

তবে এর বিপরীতে উদ্বেগ প্রকাশ করে অধ্যাপক কাউলিং বলেছেন, লকডাউন যদি খুব তাড়াতাড়ি তুলে নেওয়া হয় তাহলে স্থানীয়ভাবে ভাইরাসটি আবার ছড়িয়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমি জানি না, সামাজিক দূরত্ব যত দিন মেনে চলা প্রয়োজন তত দিন মেনে চলা হবে কি না। এর প্রতিরোধক ভ্যাকসিন আবিষ্কারের আগে আমরা শান্তি পেতে পারি না। আর ভ্যাকসিন পেতে প্রায় দেড় বছর লাগবে।”

 

 

অধ্যাপক কাউলিং আরও বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকা লকডাউন অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। তবে যেখানে মহামারি জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে, সেখানে বাছবিচারের তেমন কোনো সুযোগ নেই।

leave your comment