For a better experience please change your browser to CHROME, FIREFOX, OPERA or Internet Explorer.
মস্তিষ্কের বয়স কমাবেন যেভাবে

মস্তিষ্কের বয়স কমাবেন যেভাবে

শুরু করি একজনের গল্প দিয়ে যে মাত্র ১৪ বছর বয়সে বিষন্নতা, উদ্বেগ এর শিকার হয়ে মাদক গ্রহণ শুরু করে। ২০ বছর বয়সে তা আসক্তিতে পরিণত হয় যা ১৫ বছর ধরে  তাঁকে ভোগায়। তার পরিবার, পরিচিত সকলে, এমনকি সে নিজেও ভেবেছে এই জায়গা থেকে আর পরিত্রাণ নেই কোন। কিন্তু হঠাৎ এক মনোবল থেকে শুরু হয় পরিবর্তন। মাদকাসক্ত মস্তিষ্ক সেই ক্ষতিকর প্রভাব কাটিয়ে তো উঠেই, পাশাপাশি তা এতই শক্তিশালী হয় যে বয়স অনুযায়ী মস্তিষ্ক আরো সতেজ হয়ে উঠে।  

এটা কোন কাল্পনিক চরিত্র নয়। যার কথা বলছি তিনি আয়ারল্যান্ডের ট্রিনিটি কলেজের নিউরোসাইন্সের একজন লেকচারার, লেখক, এবং লাইফ স্ট্র্যাটেজিস্ট, ব্রায়ান পেনি। 

নিচের ছবিটায় এক নজর চোখ বুলালেই দেখা যাবে মাত্র ৫ বছরের ব্যবধানে পেনির মস্তিষ্কে কি পরিমাণে পার্থক্য এসেছে। আর তার নিজের দুটি ছবির মধ্যে বাদিকেরটি ২০১১ সালের এবং ডানের টি ২০২০। 

মানুষের মস্তিষ্ক গোলানো আটার মতো। একে যেভাবে খুশি সেভাবে বিভিন্ন আকারে রুপান্তর করা সম্ভব। এটা ব্যায়ামের মাধ্যমে শরীরের মাংসপেশি শক্তিশালী করার মতোই। নিউরোপ্লাস্টিসিটির মতে সব ধরনের অভিজ্ঞতা বা শিক্ষা মস্তিষ্কের আকার নির্ধারণ করে। তাই যেকোন নেতিবাচক চিন্তাও মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে। 

ট্রিনিটি কলেজে মস্তিষ্কের বয়স বের করার এক পদ্ধতি নিয়ে কাজ করা হয়। মস্তিষ্কের গ্রে ম্যাটারের (যা মৃত্যুহার, চিন্তা ক্ষয়, স্মৃতিভ্রংশ এর সাথে জড়িত) ঘনত্ব পরীক্ষা করা হয় এ পদ্ধতিতে। ব্রায়ান এই পরীক্ষা করে দেখেন তার মস্তিষ্ক দশ বছরে কমিয়ে আনতে তিনি সক্ষম হয়েছেন, পূর্বে যা ছিলো মাত্র ২.৮৪ বছর সজীব, বয়স এর সময়কাল অনুযায়ী। 

এখন চলুন জেনে নেওয়া যাক, কিভাবে এরকম আমূল পরিবর্তন আপনিও আনতে পারবেন।

১। নিজেকে যুক্ত না করে পর্যবেক্ষণ করুন 

আমরা সাধারণত নিজেকে নিয়ে পর্যবেক্ষণ করি না। নিজেকে সময় দিই না। এটা বুঝানোর জন্য ব্রায়ান “ক্লাউড মেটাফোর” বা মেঘ কে রুপক হিসেবে ব্যবহার করেন। ধরুন, আপনার চিন্তা, অনুভূতি সব একেকটি মেঘ। মন খারাপ বা রাগ এক ধরনের আকৃতি ও ভালো লাগা আরেক ধরনের। কোনটা ভারী, কোনটা হালকা। তবে আপনি বা আপনার সত্ত্বা মেঘ নয় বরং নীল আকাশ। আপনি এই অনুভূতি ও চিন্তার সাথে না জড়িয়ে শুধু এদের চলে যাওয়া পর্যবেক্ষণ করবেন। এটি মূলত মাইন্ডফুলনেস বা মননশীলতা চর্চার ন্যায়, যা মেডিটেশন দ্বারা অর্জন সম্ভব। 

বলা হয় যে, 

“Where attention goes, energy flows.”

তাই এই গুরত্বপূর্ণ ক্লাইড মেটাফোর এর মাধ্যমে আমরা আমাদের চিন্তা অনুভূতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়ে সেগুলো আরো বুঝতে করতে পারবো এবং যেকোন সিদ্ধান্ত নিতে পারবো সঠিকভাবে। 

২। প্রশ্ন খুঁজুন, উত্তর নয়

আমাদের মধ্যে একটি প্রবণতা আছে সব ঘটনার উত্তর খোঁজার। কিন্তু অধিকাংশ সময়েই আমরা উপেক্ষা করি ঘটনার উপর আমাদের দখল না থাকাকে। পাশাপাশি উত্তর না পেলে বা মনমতো না হলে, দুশ্চিন্তা এবং উদ্বেগ গ্রাস করে। এমনকি সবজান্তা মনোভাবই মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি বা ক্রিয়েটিভিটি কে নষ্ট করে। 

নিজেকে প্রশ্ন করা একই সাথে সহজ এবং কঠিন। আপনি যদি সার্বক্ষণিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করেন তাহলে সেই অনিশ্চয়তাও আপনাকে উদ্বিগ্ন করে তুলতে পারে। ব্রায়ান পেনি যেসকল প্রশ্ন নিজেকে করেন তা হলো বর্তমানের অবস্থা নিয়ে। 

  • এই পরিস্থিতির কোন অংশটি আমার নিয়ন্ত্রণে আছে?
  • আমি কোন বিষয়টি ক্রমাগত এড়িয়ে যাচ্ছি?
  • আমার পরামর্শদাতারা এ সম্পর্কে কী ভাবেন? 
  • আমার এই সিদ্ধান্তের ফল কতটুকু খারাপ হতে পারে?

এধরনের প্রশ্ন গুলো চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি করে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথ সহজ করে দেয়।

৩। মানসিকভাবে হাইজ্যাক হওয়া কমিয়ে ফেলুন

ছোটবেলা থেকে ঘটে যাওয়া খারাপ ঘটনা থেকে শুরু করে সকল ট্রমাটিক অভিজ্ঞতাই আমাদের এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করে যে অনুরুপ ঘটনা ঘটলে, ভয় জেঁকে বসে। এটা মস্তিষ্কের অ্যামিগডালার উপর নির্ভর করে। যা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডারের একটি উপসর্গও। এ বিষয়ে আরো জানতে পড়ুন “The Way Trauma and PTSD Shapes Your Brain” 

ব্রায়ান পেনি এই সমস্যা মোকাবেলা করতে আত্মচিন্তা (১ নং পয়েন্ট) এবং মেডিটেশন এর সহায়তা নিয়েছেন এবং এই ভীতি দূরও করেছেন।

৪। বর্তমানে লক্ষ্য রাখুন

এই বিষয়ে পূর্বেই বলেছি। চারপাশের বিষয় পর্যবেক্ষণ করা বা মাইন্ডফুলনেস প্র্যাক্টিস  অ্যামিগডালার আকার সংকোচিত করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে মস্তিষ্কের বয়স ৭.৫ বছর কমাতে সক্ষম এই চর্চায়। 

৫। স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ুন

আমরা সবচেয়ে বড় বোকামী করি ঘুম কে গুরুত্ব না দিয়ে। ৭-৯ ঘন্টা এবং সময়মতো ঘুমানো একটি পূর্ব শর্ত সুস্বাস্থ্যের। নিয়মিত ব্যায়াম করার উপকারীতা কারো অজানা নয়। 

তবে ব্রায়ান তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন মাদক এবং এলকোহল বন্ধকে। মস্তিষ্কের অতুলনীয় ক্ষতি করে থাকে এগুলো যেমন- নিউরনের মধ্যকার সংযোগ দুর্বল করে, স্ম্রৃতিশক্তি নষ্ট করে, রিফ্লেক্স ধীর করে।

স্বাস্থকর খাবার খাওয়াও আবশ্যক মস্তিষ্কের সতেজতা বৃদ্ধিতে। 

৬। চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করুন 

নিজেকে সমৃদ্ধ করতে চাইলে চ্যালেঞ্জের কোন বিকল্প নেই। কিন্তু হেরে যাওয়া আজকাল হয়ে পড়েছে দুর্বলতার উপসর্গ। তাই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা থেকে অনেকেই বিরত থাকে।  অথচ হারতেও প্রয়োজন হয় দৃঢ় মানসিক শক্তি অর্জন করা, অনেক কিছুর সম্পর্কে জানা, পরিশ্রম করা। আর এই প্রত্যেকটা অসম্ভব প্রয়োজন চিন্তার বিকাশে। তাই বলুন, 

“Fail. But fail forward.”

৭। নিজেকে এবং নিজের কাজকে ভালোবাসুন

সবাই জীবনে কয়েকটা বিষয়ে ভাবেন যে “আমি আমার চাকরি/পড়াশুনা নিয়ে অসন্তুষ্ট” বা “মানুষ কি বলবে?” এই চিন্তা ঝেড়ে ফেলুন। আপনার কাজ ইতিবাচক হলে, সব নেতিবাচক চিন্তা, পরামর্শ, মতামত কে উড়িয়ে দিন। 

ব্রায়ান পেনি যদি নিজের ও পরিবারের আশঙ্কা নিয়েই ভাবতেন, আজ হয়তো তাঁর এই পর্যন্ত আসা হতো না। তাই এগিয়ে যান ভালো কিছুর দিকে। 

এই অভ্যাসগুলো ব্রায়ান পেনি আয়ত্ত্বে আনার কারণেই ধীরে ধীরে বাহ্যিক লাইফস্টাইলের পাশাপাশি এনেছে মস্তিষ্কে পরিবর্তন। কমিয়েছে মস্তিষ্কের বয়স। এজন্যই বলা হয় “মানুষ অভ্যাসের দাস।”

তবে উপরের সকল পয়েন্টই অনর্থক মনে হবে যদি নিজেকে কখনো অগ্রাধিকার না দিয়ে থাকেন। তাই প্রথমেই দৃঢ়সংকল্প করুন আর মাইন্ডফুল প্র্যাকটিস এর মাধ্যমে শুরু করে দিন নতুন অধ্যায়। 

leave your comment