For a better experience please change your browser to CHROME, FIREFOX, OPERA or Internet Explorer.
বিশ্বজুড়ে শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈচিত্র‍্যময়  কিছু উদ্ভাবন

বিশ্বজুড়ে শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈচিত্র‍্যময় কিছু উদ্ভাবন

 

সারা বিশ্ব এখন সময়ের সাথে সাথে অভাবনীয় গতিতে পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এরই সাথে তাল মিলিয়ে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের শিক্ষাব্যবস্থায়ও এসেছে নতুন নতুন পরিবর্তন। শিক্ষায় নিত্য নতুন উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক অনেক পরিবর্তন ঘটে চলছে প্রতিনিয়ত। বৈচিত্র‍্যময় উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে কিছু কিছু দেশ প্রচলিত শিক্ষার ধারা থেকে বের হয়ে এসে অবিশ্বাস্য সাফল্য অর্জন করেছে। বিশ্বের এমনি কয়েকটি দেশের শিক্ষায় বৈচিত্র‍্যময় কিছু উদ্ভাবন সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক।

 

১. রোবট শিক্ষক: কেমন হয় যদি আপনি ক্লাসরুমে বসে ইংরেজি, গণিত কিংবা বিজ্ঞানের মত কোন একটি বিষয়ের ক্লাস করছেন কিন্তু আপনার সামনে কোন শিক্ষক নেই। তার পরিবর্তে রয়েছে একটি রোবট। সেই রোবটই পুরো শ্রেণিকক্ষ ঘুরে ঘুরে আপনাকে শেখাচ্ছে ইংরেজি ব্যাকরণ কিংবা গণিত অথবা বিজ্ঞানের জটিল জটিল সূত্র। 

দক্ষিণ কোরিয়ার বেশ কিছু বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা এভাবেই ইংরেজি শিখছে ইংকি (Engkey) নামের রোবটের কাছে। দেখতে কিছুটা ডিম্বাকৃতির এই রোবটটি মূলত একটি টেলিপ্রেজেন্স রোবট! একে নিয়ন্ত্রণ করা হয় শ্রেণিকক্ষের বাইরে থেকে। রোবটটি সংযুক্ত থাকে একজন মানব শিক্ষকের সাথে, যার চেহারা রোবটের সাথে সংযুক্ত স্ক্রিনে দেখতে পায় শিক্ষার্থীরা। এর মাধ্যমে আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া থেকে শিক্ষকরা কোরিয়ান শিক্ষার্থীদের সাথে সরাসরি যুক্ত হয়ে তাদেরকে শ্রেণিকক্ষে পড়াতে পারে। শ্রেণিকক্ষে রোবট শিক্ষক ব্যবহারের ফলে একদিকে যেমন দক্ষিণ কোরিয়ায় অভিজ্ঞ ইংরেজি শিক্ষার শিক্ষক ঘাটতির সমাধান হচ্ছে, পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মাঝেও ইংরেজি শেখার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 

 

 

২. ত্রিমাত্রিক ক্লাসরুম: ত্রিমাত্রিক চশমা (থ্রিডি গ্লাস) পরিহিত একদল মানুষ বসে তাকিয়ে আছে সামনের পর্দায় ভেসে ওঠা ছবির দিকে। না, কোনো সিনেমা হলের কথা বলছি না এখানে। 

সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেমস মর্ডান একাডেমির (GMA) শ্রেণিকক্ষ গুলোর চিত্র কিছুটা এরকমই। এখানকার শ্রেণিকক্ষগুলো সংযুক্ত থাকে অতিদ্রুত গতি সম্পন্ন ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক দ্বারা। প্রধানত বিজ্ঞান বিষয়ক পাঠগুলোই এই ত্রিমাত্রিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরা হয়। প্রযুক্তির এই উন্নয়নের ফলে এখানকার শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানকে এখন আর কোন বিমূর্ত ধারণা হিসেবে শিখছে না বরং শিখছে বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভের মাধ্যমে। মানব মস্তিষ্কের হলোগ্রাম কিংবা সৌরজগতের গ্রহগুলোকে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অনুভব করার মাধ্যমেই শিক্ষার্থীরা জানতে পারছে বিজ্ঞানের আশ্চর্যজনক ও চমকপ্রদ বিষয়গুলো সম্পর্কে।

 

 

 

৩. প্রকৃতির মাঝেই শিক্ষা: কেমন হয় যদি, “আজ স্কুলে কি কি করেছো?”- এর উত্তর হয় “আজ আমি গাছে উঠেছি”, ” মাটি দিয়ে খেলনা বানিয়েছি” কিংবা “পাতা দিয়ে খেলনা বানানো শিখেছি”।

ডেনমার্ক এর স্কুলগুলোতে বাচ্চারা চার দেয়ালে আবদ্ধ শ্রেণিকক্ষে বসে না থেকে এভাবেই প্রকৃতির মাঝে থেকেই শুরু করে তাদের শিক্ষার হাতেখড়ি। যা “ফরেস্ট কিন্ডারগার্টেন” নামে পরিচিত।  “ফরেস্ট কিন্ডারগার্টেন” এমন একটি পদ্ধতি যেখানে শিশুরা প্রকৃতির মাঝেই খেলতে খেলতে তাদের মাঝে শেখার আগ্রহ ও আকর্ষণ তৈরি হয়। ৩-৭ বছর বয়সী শিশুরা এখানে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে বেড়ে ওঠার এবং ভবিষ্যৎ  আনুষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য তৈরি হওয়ার সুযোগ পায়। এখানে শিশুরা নিজেরাই মাটি দিয়ে, পাতা দিয়ে, গাছের ছোট ছোট ডালপালা দিয়ে খেলনা বানায়। শিক্ষকরা গাইডের ভূমিকা পালন করেন। “ফরেস্ট কিন্ডারগার্টেন” এর নির্দিষ্ট কোন কাঠামো নেই। এলাকা ভেদে, ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে ভিন্ন ভিন্ন কাঠামোর ফরেস্ট কিন্ডারগার্টেন গড়ে তোলা হচ্ছে পুরো ডেনমার্ক জুড়ে। শুধু মাত্র ডেনমার্কেই নয়, বেশিরভাগ স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতেই এধরনের ফরেস্ট কিন্ডারগার্টেন ব্যবস্থা চালু রয়েছে।

 

 

৪. জাদুঘর স্কুল: ছোট বাচ্চারা ময়লা আবর্জনার মাঝেই খেলছে, মারামারি করছে, কয়েকজন হয়ত জীবিকার তাগিদে অর্থ উপার্জনেও নেমে পরেছে- বস্তিতে বসবাসকারী শিশুদের একটি সাধারন দিনের কথা উঠলে এমন একটা দৃশ্যই হয়ত আমাদের সবার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এবার একটু উল্টো চিত্র কল্পনা করা যাক- সুবিধাবঞ্চিত এইসব শিশুরাই দলবেধে স্কুলে যাচ্ছে, বিজ্ঞানকে জানছে বিভিন্ন পরীক্ষণের মাধ্যমে, ইতিহাস শিখছে প্রাচীন চিত্রকল্প দেখে। এভাবেই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে ভারতের মধ্যপ্রদেশের ভোপাল শহরে গড়ে তোলা হয়েছে অনন্য এক স্কুল, “পারভারিশ: মিউজিয়াম স্কুল”। 

 

 

নামের মতই জাদুঘরকে কেন্দ্র করেই এই স্কুল। জাদুঘর স্কুল বিভিন্ন জাদুঘরের সহযোগিতায়, জাদুঘর গুলোকেই শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে ধরে তাদের পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচী তৈরি করে। এই জাদুঘর স্কুল ২০০৫ সাল থেকে মধ্যপ্রদেশের ৫টি জাদুঘরের সাথে একসাথে কাজ করে আসছে। প্রতিটি জাদুঘরই বিষয়কেন্দ্রিক। যেমন: বিজ্ঞানের জন্য রয়েছে বিজ্ঞান জাদুঘর, ইতিহাসের জন্য প্রত্নতত্ত্ব জাদুঘর, পরিবেশ বিজ্ঞানের জন্য প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘর। এসকল জাদুঘরের প্রদর্শনীর ধারণা ও কার্যকারিতাসমূহ শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের মাঝে সঠিকভাবে, সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করে থাকে। সহজ-সঠিক ব্যাখ্যা ও নিজে চোখে দেখার মাধ্যমে বিষয়গুলো শিক্ষার্থীরা সহজেই বুঝতে পারে। যা পরবর্তিতে তাদের মূলধারার শিক্ষা ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করতে সাহায্য করে।

 

 

“পারভারিশ: মিউজিয়াম স্কুল” কে শিক্ষার সম্প্রসারণে তাদের অবদানের জন্য ২০১৬ সালে “ইউনেস্কো এশিয়া-প্যাসিফিক এডুকেশন ইনোভেশন” এ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়।

 

রোবট কিংবা ত্রিমাত্রিক প্রযুক্তি থেকে শুরু করে প্রকৃতি কিংবা জাদুঘর, সকল ধরণের উদ্ভাবনী পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষাকে যেমন আনন্দদায়ক ও আকর্ষণীয় করে তুলছে, পাশাপাশি  শিক্ষার মান উন্নয়ন ও সম্প্রসারণেও কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্বের প্রতিটি দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন নতুন, বৈচিত্র‍্যময় ও কার্যকরী সব পদ্ধতির উদ্ভাবন ও প্রয়োগই পারে বিশ্বের প্রতিটি মানুষের জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে।

 

leave your comment