For a better experience please change your browser to CHROME, FIREFOX, OPERA or Internet Explorer.
ডাউন সিনড্রোম: জীবনব্যাপী এক ব্যাধি

ডাউন সিনড্রোম: জীবনব্যাপী এক ব্যাধি

বৃষ্টির (কাল্পনিক নাম) জন্মের পরেই তার চেহারার বিশেষ গঠনগত ভিন্নতা দেখে বাবা মা বুঝতে পেরেছিলেন তাদের সন্তান আর পাঁচ দশটা সাধারণ শিশুর মতন নয়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে বৃষ্টির চেহারার এ গঠনগত ভিন্নতা আরো ভালো করে প্রকাশ পেতে থাকে। বৃষ্টির মাথাটা শরীরের তুলনায় বড়, হাত পা গুলো স্বাভাবিকের তুলনায় ছোট, চোখগুলো কুঁচকানো, নাক অনেকটাই চ্যাপ্টা। ধীরে ধীরে তার মধ্যে আচরণগত বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়া শুরু করলে বৃষ্টির বাবা মা তাকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। তিনি জানান বৃষ্টি ডাউন সিনড্রোমের শিকার।

 

ডাউন সিনড্রোম একটি বিশেষ ধরণের জেনেটিক অবস্থা। ১৮৬৬ সালে ব্রিটিশ চিকিৎসক জন ল্যাংডন ডাউন সর্বপ্রথম এ ধরণের জেনেটিক রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিহ্নিত করেন বলে তার নামানুসারেই এর নামকরণ করা হয় ডাউন সিনড্রোম। এটি এক ধরণের জন্মগত জেনেটিক সমস্যা। সাধারণ মানুষের ক্রোমোজোমের গঠনের সাথে ডাউন সিনড্রোম নিয়ে জন্ম নেয়া মানুষের ক্রোমোজোমের গঠনের ভিন্নতা দেখা যায়। অর্থাৎ ক্রোমোজোমের গঠনের ভিন্নতা বা অসংগতির কারণেই একটি শিশু ডাউন সিনড্রোম নিয়ে জন্ম নেয়।

মানবদেহে অবস্থান করা অসংখ্য ডিএনএ’র সমন্বয়ে গঠিত হয় ক্রোমোজোম। আমাদের দেহের প্রতিটি কোষের মধ্যেই রয়েছে ২৩ জোড়া করে ক্রোমোজোম। এই ২৩ জোড়া ক্রোমোজোমের অর্ধেক আসে মায়ের কাছ থেকে আর অর্ধেক আসে বাবার কাছ থেকে। কিন্তু অনেকের দেহের প্রতিটি কোষেই ২১ তম ক্রোমোজোমটির সাথে আরো একটি অতিরিক্ত ক্রোমোজোম যুক্ত থাকতে পারে, সেটি হতে পারে আংশিক কিংবা পূর্ণরূপে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় Trisomy-21। মূলত এই অতিরিক্ত ক্রোমোজোমের কারণেই একটি শিশু ডাউন সিনড্রোম নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। আর ক্রোমোজোমের এ অসংগতির কারণে ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত মানুষের মাঝে বেশ কিছু শারীরিক ও মানসিক ত্রুটি লক্ষ্য করা যায়। 

ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত শিশুদের সাধারণ কিছু শারীরিক বৈশিষ্ট্য-

  • ‌চোখ কিছুটা কুঁচকানো থাকে। 
  • ‌সাধারণ মানুষের মত সোজা দৃষ্টি থাকে না। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় চোখের কোণা উপরের দিকে ওঠানো থাকে।
  • ‌দেহের তুলনায় মাথার আকৃতি কিছুটা বড় থাকে
  • ‌নাক স্বাভাবিকের চেয়ে চ্যাপ্টা থাকে
  • ‌কানের আকৃতি ছোট হয়
  • ‌অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জিহ্বা মুখ থেকে কিছুটা বের হয়ে থাকে যার ফলে লালাক্ষরণ হতে থাকে
  • ‌সাধারণ মানুষের তুলনায় মাংসপেশি শিথিল হয়ে থাকে। কিংবা এর বিপরীতও হয়ে থাকে। অর্থাৎ মাংসপেশি অনেক বেশি শক্ত থাকে
  • ‌উচ্চতায় কিছুটা খর্বাকৃতির হয়ে থাকে

এ ধরণের শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণে পূর্বে ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্তদের Mongoloid বলা হত। শারীরিক এসকল ত্রুটির কারণে আক্রান্তদের মাঝে বিভিন্ন ধরণের জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে। ওবেসিটি বা মেদ বৃদ্ধি পাওয়া এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও কানে না শোনা বা বধিরতা, দাঁত উঠতে বিলম্ব হওয়া, তাড়াতাড়ি দাঁত পড়ে যাওয়া, মাড়ির সংক্রমণ ইত্যাদি জটিলতা দেখা দিতে পারে। কখনো কখনো আরো গুরুতর কিছু সমস্যাও দেখা যায়। যেমন- আ্যনিমিয়া বা রক্ত স্বল্পতা, লিউকেমিয়া বা ব্লাড ক্যান্সার এবং থাইরয়েড ও হৃদপিন্ডের বিভিন্ন সমস্যা।

 

শারীরিক বৈশিষ্ট্য বা ত্রুটির পাশাপাশি ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত শিশুদের মাঝে বিশেষ কিছু আচরণিক বৈশিষ্ট্যও দেখা যায়-

  • ‌অনেক দেরিতে কথা বলতে শেখে
  • ‌কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় শিশুদের স্পিচ একদমই বিকাশ হয় না
  • ‌বয়সের সাথে সাথে তাদের জ্ঞানীয় বিকাশ ঘটে না
  • ‌বুদ্ধিমত্তা সাধারণের চেয়ে অনেক কম থাকে
  • ‌আশেপাশের কোন কিছুই তাদের ওপর কোন প্রভাব ফেলে না।
  • ‌সবকিছুতেই প্রচন্ড অমনোযোগী থাকে
  • ‌কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনেক ছটফটে স্বভাবের হয়ে থাকে

 

চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এখনো হঠাৎ কেন কোষে ক্রোমোজোম সংখ্যা বেড়ে যায় তার সঠিক কারণ বের করতে পারেনি। তবে তারা ধারণা করেন যে, কিছু কিছু ফ্যাক্টরের কারণে ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। মায়ের বয়স এখানে একটি উল্লেখযোগ্য ফ্যাক্টর। বেশি বয়সী মায়েদের সন্তানদের মধ্যে ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ৪০ বছর বয়সী প্রতি ১০০ জন মায়ের মধ্যে একজন মা ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত শিশুর জন্ম দেন। পঁয়ত্রিশোর্ধ্ব বয়সে গর্ভধারণ তাই ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত শিশু জন্মের ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়াও বংশগত কারণেও এ সমস্যা নিয়ে শিশু জন্মগ্রহণ করতে পারে। বাবা যদি বাহক হন তাহলে শিশুর ডাউন সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি ৩% এবং মা বাহক হলে শিশুর ডাউন সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি থাকে ১৫%। আবার পরিবারে প্রথম সন্তানের ডাউন সিনড্রোম থাকলে পরবর্তী সন্তানদের মাঝেও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

 

ডাউন সিনড্রোম যেহেতু একটি জন্মগত সমস্যা তাই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। কিন্তু সমস্যাটি দ্রুত চিহ্নিত করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বিভিন্ন থেরাপির মাধ্যমে আক্রান্ত শিশুর জীবনযাপন কিছুটা স্বাভাবিক করা যায়। ফিজিওথেরাপিস্ট, অকুপেশনাল থেরাপিস্টদের সমন্বয়ে কাজ করে শিশুর ভাষার দক্ষতা, শারীরিক দক্ষতা অনেকটাই স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, আমাদের দেশে প্রতি বছর ৫,০০০ বা প্রতিদিন প্রায় ১৫টি  শিশু ডাউন সিনড্রোম নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। পৃথিবীতে জন্ম নেয়া প্রতি ৫০০ শিশুর মধ্যে একটি শিশুর ডাউন সিনড্রোম থাকে। চিন্তার বিষয় হচ্ছে এ সংখ্যা দিনে দিনে আরো বাড়ছে। তবে ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত শিশুর হার কমাতে WHO সহ  বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান চিকিৎসা ও জনসচেতনতামূলক বিভিন্ন কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের দেশেও যেহেতু আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা একেবারেই কম নয়, তাই সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের পাশাপাশি সামাজিক ও ব্যক্তিগত পর্যায় থেকেও সকলের এগিয়ে আসা উচিৎ যাতে করে সকলের মাঝেই ডাউন সিনড্রোম নিয়ে সচেতনতা আরো বৃদ্ধি পায় এবং আক্রান্ত শিশুদের জীবনকে আরেকটু সুন্দর ও স্বাভাবিক করে গড়ে তোলা যায়।

leave your comment