For a better experience please change your browser to CHROME, FIREFOX, OPERA or Internet Explorer.
টুরেটস সিনড্রোম: মাংসপেশির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার এক রোগ

টুরেটস সিনড্রোম: মাংসপেশির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার এক রোগ

বন্ধুদের আড্ডায় হঠাৎ করেই লক্ষ করলেন আপনার কোন বন্ধু অকারণেই কাঁধ ঝাঁকাচ্ছেন। কিংবা পাশের বাড়ির ছোট ছেলেটাকে প্রায়ই দেখেন খুব বেশি চোখের পাতা পিটপিট করে। কিংবা আপনার পরিবারের কারো মাঝেই লক্ষ করেছেন অকারণেই গলা দিয়ে অদ্ভুত আওয়াজ বের করে প্রায়ই। আপনার কাছে এ ধরণের আচরণ কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হলেও যাদের মাঝে এসকল আচরণিক বৈশিষ্ট্যগুলো দেখছেন তারা কিন্তু নিজের ইচ্ছায় এরকমটা করছে মনে করার কোন কারণ নেই। তারা আসলে এ ধরণের অঙ্গভঙ্গিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এ ধরণের সমস্যাকে মেডিকেলের ভাষায় বলা হয় “টুরেটস সিনড্রোম”।

 টুরেটস সিনড্রোম একধরণের নিউরোলজিকার সমস্যা। এর নামকরণ করা হয়েছে ফরাসি নিউরোলজিস্ট জিল ডে লা টুরেট এর নাম অনুসারে। মানুষের ব্রেইনে কোন নিউরোট্রান্সমিটার পরিমাণের তুলনায় বেশি কিংবা কম থাকলে টুরেটস সিনড্রোম হতে পারে। টুরেটস সিনড্রোম মূলত একধরণের টিক ডিজঅর্ডার। এখন প্রশ্ন হচ্ছে টিক ডিজঅর্ডার কি?- টিক বা টিকস হচ্ছে আপনার শরীরের মাংসপেশির আন্দোলন যা আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকে না। সহজভাবে বলতে গেলে, টিক হলো শরীরের কিছু মুভমেন্ট অথবা হঠাৎ কোন আওয়াজ করা যা পুরোপুরি অনিচ্ছাকৃত। টিক অনেকটা হেঁচকির মত। হেঁচকির উপর যেমন আমাদের কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না, টিক এর উপরও তেমনি শরীরের কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না।

টুরেটস সিনড্রোমে মূলত দুইধরণের টিকস হতে পারে- মোটর টিকস ও ভোকাল টিকস। খুব ঘন ঘন চোখের পলক ফেলা, কাঁধ, মাথা বা হাত ঝাঁকানোর মত অনিচ্ছাকৃত শারীরিক মুভমেন্ট ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য মোটর টিকস এর অন্তর্ভুক্ত। আবার অকারণেই মুখ দিয়ে আওয়াজ বের করা, ঘন ঘন গলা পরিষ্কার করা, গুনগুন আওয়াজ করা ইত্যাদি হলো ভোকাল টিকস। কিছু কিছু টিকস থাকে খুবই সাধারণ, যেগুলো অনেক সুস্থ্য মানুষের মাঝেও দেখা যায়। আবার কিছু কিছু টিকস থাকে খুবই জটিল প্রকৃতির। শুধুমাত্র টুরেটস সিনড্রোমে আক্রান্তদের মাঝেই দেখা যায়। টুরেটস সিনড্রোমের কারণে অনেক সময় একসাথে একাধিক টিকসও দেখা যায়। সাধারণত দেখা যায় যখন কারো মাঝে স্ট্রেস খুব বেশি থাকে টিকসের মাত্রাও তখন বেড়ে যায়।

 

প্রধান প্রধান লক্ষণ-

টুরেটস সিনড্রোমের প্রধান লক্ষণই হলো টিক। এ টিক গুলো সাধারণত ৫-১০ বছর বয়সের মধ্যেই প্রকাশ পেতে থাকে। শিশুকালে টুরেটস সিনড্রোমের লক্ষণ গুলো দেখা দিলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সাথে সাথে লক্ষণগুলো হ্রাস পেতে থাকে। কিন্তু কখনো কখনো বয়স বাড়ার সাথে সাথে লক্ষণগুলো আরো বাড়তেও পারে। তখনই আসলে বলা হয় যে কোন ব্যক্তি টুরেটস সিনড্রোমে আক্রান্ত। টুরেটস সিনড্রোমের প্রধান লক্ষণ গুলো হলো-

মোটর টিক- 

  • ‌শরীরের কোন পেশির অস্বাভাবিক স্পন্দন
  • ‌মাথা ও ঘাড়ের পেশিগুলো নিয়ন্ত্রণে না থাকা
  • ‌অস্বাভাবিক হারে চোখের পলক ফেলা
  • ‌মুখের পেশি হঠাৎ করেই ঝাঁকি দেয়া

ভোকাল টিক-

  • ‌অকারণেই মুখ দিয়ে বিভিন্ন আওয়াজ করা
  • ‌ঘন ঘন কাশি দেয়া
  • ‌চিৎকার করে ওঠা
  • ‌ঘন ঘন নাকের মাধ্যমে বাতাস টানা
  • ‌হঠাৎ হঠাৎ দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরা
  • ‌ঘোঁৎ ঘোঁৎ আওয়াজ করা

 

টুরেটস সিনড্রোমের আরো একটি উপসর্গ হলো Coprolalia. Coprolalia হলো যখন ভোকাল টিক খুবই জটিল পর্যায়ে চলে যায় তখন আক্রান্ত ব্যক্তির মুখ থেকে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ বের হতে পারে। অশোভন আচরণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থাকে আমাদের ব্রেইনের। কিন্তু Coprolalia এর ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি সেই নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। তবে Coprolalia খুবই বিরল।  আক্রান্তদের মাঝে ১০-১৫% এর মাঝে এ ধরণের বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। আরো একটি উল্লেখযোগ্য উপসর্গ হলো আক্রান্ত ব্যক্তি অন্যের কাছ থেকে যা কিছুই শোনে তা বারবার আওড়াতে থাকে। এ কাজটি যখন খুব গুরুতর পর্যায়ে চলে যায় তখন তাকে Echolalia বলা হয়ে থাকে।

টুরেটস সিনড্রোম আসলে কি কারণে হয়ে থাকে তা পরিষ্কারভাবে এখনো জানা যায় নি। তবে অনেকেই ধারনা করে থাকেন যে এটি বংশগত কিংবা জিনগত রোগ। তবে সাম্প্রতিককালে অনেকেই মনে করছেন যে টুরেটস সিনড্রোম আসলে শুধুমাত্র জিনগত কিংবা বংশগত কারণেই হয়ে থাকে এ ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়। জিনগত ও বংশগত ফ্যাক্টরের পাশাপাশি একটি শিশুর পারিপ্বার্শিক অবস্থাও অনেকটাই প্রভাব ফেলে এ সিনড্রোমে আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে। এছাড়াও গর্ভকালীন সময়ে মায়ের প্রচন্ড মানসিক অশান্তি, জন্মের সময় বাচ্চার মস্তিষ্কে অক্সিজেনের স্বল্পতা, বাচ্চার অতিরিক্ত কম ওজন ইত্যাদি কারণকেও ধারণা করা হয় টুরেটস সিনড্রোমের আরো কিছু উল্লেখযোগ্য ফ্যাক্টর।

অধিকাংশ ক্ষেত্রেই টুরেটস এ আক্রান্ত ব্যক্তির টিকস গুলো বয়স বাড়ার সাথে সাথে কমে যেতে থাকে এবং এক পর্যায়ে ব্যক্তি কোন চিকিৎসা ছাড়াই সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। অনেকের ক্ষেত্রে আবার টিকস গুলো অতটা প্রকট না হওয়ার কারণেও কোন চিকিৎসার প্রয়োজন পরে না। তবে যাদের ক্ষেত্রে টিকস এর কারণে স্বাভাবিক কর্মকান্ডে বিঘ্ন ঘটে থাকে তাদের জন্য অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিৎ। সাধারণত যেসকল ঔষধ মনোরোগের জন্য দেয়া হয়ে থাকে, টুরেটস এর চিকিৎসায়ও সেসকল ঔষধ ব্যবহার করে হয়। কিন্ত দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় এসকল ঔষধ ততটা কার্যকরী হচ্ছে না। আজকাল ডিপ ব্রেইন স্টিমুলেশন নামের একধরণের জটিল অপারেশন পদ্ধতিও টুরেটস চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে। যদিও এটি ঝুঁকিপূর্ণ একটি পদ্ধতি, কিন্তু খুব জটিল টুরেটস এ আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য এটি একটি আশার আলো। 

টুরেটস সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অনেক সময়ই সামাজিক ভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা হয়। কিন্ত ইতিহাসে এমন অনেক ব্যক্তিত্ব আছেন যারা টুরেটস সিনড্রোমে আক্রান্ত হয়েও নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেছে। বিখ্যাত ফুটবলার ডেভিড বেকহাম, মোৎজার্ট, লেখক স্যামুয়েল জনসনসহ অনেকেই টুরেটস সিনড্রোমে আক্রান্ত ছিলেন। বলাই বাহুল্য এটি তাদের সফলতার পথে কোন বাঁধাই আনতে পারে নি। তাই আমাদের সকলেরই উচিৎ টুরেটস সিনড্রোম সম্পর্কে আরো একটু সচেতন হওয়া এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের পাশে থেকে তাদেরকে জীবনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য যথাসম্ভব সাহায্য করা।

leave your comment