For a better experience please change your browser to CHROME, FIREFOX, OPERA or Internet Explorer.
জ্যাক মাঁ যেভাবে আলিবাবাকে নিয়ে গেছেন সাফল্যের চূড়ায়

জ্যাক মাঁ যেভাবে আলিবাবাকে নিয়ে গেছেন সাফল্যের চূড়ায়

“আলিএক্সপ্রেস” এর নাম কমবেশি সবাই আমরা শুনেছি। অনেকের কাছেই “আলিএক্সপ্রেস” অত্যন্ত পরিচিত একটি নাম, যার মাধ্যমে ঘরে বসে সহজেই খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে নিজের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিস কিনতে পারা যায়। জনপ্রিয় এই ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মটির প্রতিষ্ঠার সাথে জড়িয়ে আছে আরো একটি নাম,  আর সেটি হলো “আলিবাবা গ্রুপ”। “আলিবাবা” নামক চাইনিজ মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির একটি অংশই হলো আলিএক্সপ্রেস। খুচরা বিক্রেতাদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম আলিবাবা। আলিবাবা হলো চীনের সবচেয়ে বড় এবং কিছু কিছু দিক থেকে বিশ্বেরও সবচেয়ে বড় অনলাইন বাণিজ্য সংস্থা। এত বিশাল ও সফল একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠার সফরটি সহজ ছিলো না এর প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মাঁ এর জন্য।

 

১৯৯৯ সালে আলিবাবা প্রতিষ্ঠার আগে জ্যাক মাঁকে বহু উত্থান পতনের সম্মুখীন হতে হয়েছে। জ্যাক মাঁর জীবনে ব্যর্থতার গল্পও নেহাত কম ছিলো না। প্রাথমিক স্কুলে দু’বার ও মাধ্যমিক স্কুলে তিনবার অকৃতকার্য হন। হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ে দশবার ভর্তির আবেদন করেন এবং প্রতিবারই বাদ পরে যান। স্নাতক শেষ হওয়ার আগেই এবং স্নাতক শেষ হওয়ার পর ত্রিশবার চাকরির আবেদন করেও কোন চাকরি পাননি। এমনকি আলিবাবা প্রতিষ্ঠার আগে আরো দুটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ তিনি গ্রহণ করেছিলেন। বলা বাহুল্য, সে উদ্যোগ দুটিও সফলতার মুখ দেখতে পায়নি। 

 

১৯৯৫ সালে চীন সরকারের একটি প্রজেক্টের কাজে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সুযোগ হয় জ্যাক মাঁর। সেখানে গিয়ে তিনি প্রথমবারের মত কম্পিউটার ও ইন্টারনেট এর সাথে পরিচিত হন। তৎকালীন সময়ে চীনে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সুবিধা তেমন একটা ছিলো না বললেই চলে। প্রথমবারের জন্য তাই এ ধরনের নতুন প্রযুক্তি জ্যাক মাঁকে বিস্মিত করে। নতুন প্রযুক্তির সাথে পরিচিত হওয়ার পর পরই ই-কমার্স স্টার্টআপ এর আইডিয়া নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেন তিনি। এই ই-কমার্স স্টার্ট আপটিই পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আলিবাবা গ্রুপ হিসেবে। 

 

প্রথমদিকে ছোট পরিসরেই শুধু বন্ধুদের বিনিয়োগে চলতে থাকলেও কিছু সময়ের মধ্যেই বাইরে থেকে মূলধন সংগ্রহ শুরু করেন জ্যাক মাঁ। ‘সফটব্যাংক’ থেকে ২০ মিলিয়ন ডলার ও ‘গোল্ডম্যান স্যাকস’ থেকে ৫ মিলিয়ন ডলার মূলধন যোগাড় করার মাধ্যমে ধীরে ধীরে আলিবাবার আরো বড় পরিসরে বিস্তার ঘটাতে সক্ষম হন। যদিও চীনের মানুষজনকে অনলাইন বিজনেস এর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক যেমন- অনলাইন পেমেন্ট, প্যাকেজ ডেলিভারি ইত্যাদি বিষয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে প্রথমদিকে বেশ হিমশিম খেতে হয় আলিবাবা গ্রুপকে। পরবর্তীতে ঠিকই সফলভাবে এগিয়ে যেতে থাকে বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই বাণিজ্য সংস্থাটি।

 

আলিবাবা নামকরণের পিছনেও রয়েছে মজার একটি কাহিনী। নামটির ধারণা মূলত এসেছে ‘আলিবাবা ও চল্লিশ চোর’ নামক বিখ্যাত গল্পটি থেকে। জ্যাক মাঁ চেয়েছিলেন এমন একটি নাম যার সাথে সাধারণ জনগণ যেন পরিচিত থাকে। আর আলিবাবা ও চল্লিশ চোর এর গল্প কার না জানা আছে! সকলের কাছেই পরিচিত এক গল্পের চরিত্র থেকেই তাই তিনি নামটিকে বেছে নেন নিজের কোম্পানির নাম হিসেবে। 

 

বিশাল অংকের বিনিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই আলিবাবা কোম্পানির বৃদ্ধি  বাড়তে থাকে। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে আলিবাবা কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে “Taobao.com”। Taobao আলিবাবার সবচেয়ে বড় শপিং সাইট। প্রায় সাত মিলিয়ন ব্যবসায়ী এখানে তাদের পণ্য বেচাকেনা করে থাকে। ব্যবহারকারীদের জন্য সাইটটি সম্পূর্ণ ফ্রি হলেও বিক্রেতারা নিজের পণ্যের বিজ্ঞাপন করতে চাইলে অর্থের বিনিময়ে তা করতে পারেন। 

Taobao এর সফলতার ধারাবাহিতায় আলিবাবা ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠা করে থার্ড পার্ট অনলাইন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম “Alipay”। Alipay অনেকটাই PayPal এর মতই কাজ করে থাকে। ২০১৩ সালে Alipay বিশ্বের বৃহত্তম মোবাইল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম হিসেবে PayPal কেও ছাড়িয়ে যায়। 

 

Taobao ও Alipay এর পাশাপাশি আলিবাবা কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে আরো একটি ব্যবসাসফল প্ল্যাটফর্ম, “Aliwangwang”। এটি মূলত একটি ইন্সট্যান্ট ম্যাসেজিং টুল। বর্তমানে এটি Taobao এ বিক্রেতাদের সাথে যোগাযোগের জন্য বহুল ব্যবহৃত একটি টুল। Taobao.com, Alipay ও Aliwangwang এ তিনটি উদ্যোগের ফলেই মূলত আলিবাবার সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে আছে। এই উদ্যোগ তিনটিকে একত্রে বলা হয় ই-কমার্সের ‘আয়রন ট্রায়াঙ্গল’। এছাড়াও  ২০০৮ সালে Tmall ও ২০১০ সালে আমাদের সকলের পরিচিত Aliexpress এর প্রতিষ্ঠাও আলিবাবার সফলতার মুকুটে আরো পালক জুড়ে দেয়। 

 

২০১৪ সালে আলিবাবার ২৫২ বিলিয়ন ডলারের আইপিও তখনকার সময়ের জন্য ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বৃহত্তম। ২০১৮ সালের হিসেব অনুযায়ী এটি এশিয়ার দ্বিতীয় কোম্পানি যার ভ্যালুয়েশন মার্ক ৫০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসের হিসেব অনুযায়ী এ কোম্পানির মার্কেট ভ্যালু প্রায় ৬১৫ বিলিয়ন ডলারে পৌছে গেছে। বর্তমানে জ্যাক মাঁ চীনের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি এবং সারাবিশ্বের ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় ২১তম।

আলিবাবার সফলতার পথটা সহজ ছিলো না। বারবার ব্যর্থতার সম্মুখীন হওয়ার পর, কম্পিউটার ও ইন্টারনেট এর সাথে তেমনভাবে পরিচিত নয় এমন একটি জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করে ই-কমার্সের মত একটি স্টার্ট আপ এর পরিকল্পনা করা ছিল সত্যিই একটি সাহসী পদক্ষেপ। কিন্তু জ্যাক মাঁ তার দক্ষ নেতৃত্ব, কঠোর পরিশ্রম ও বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে আলিবাবাকে আজ বিশ্বের সকলের কাছে অন্যতম সফল একটি কোম্পানি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে তুলেছেন।

leave your comment