For a better experience please change your browser to CHROME, FIREFOX, OPERA or Internet Explorer.
অটিজম: কী, কেন এবং অন্যান্য

অটিজম: কী, কেন এবং অন্যান্য

অর্কের বয়স চার। সে এখনও ঠিকমত কথা বলতে পারে না। কেউ ডাকলে খুব একটা সাড়া দেয় না, কখনো সরাসরি চোখের দিকে তাকায় না। সমবয়সীদের সাথে খেলাধুলাও করে না বরং একা থাকতেই বেশি পছন্দ করে। যেই বয়সে একটা বাচ্চার খেলার ঝোঁক সবচেয়ে বেশি হওয়ার কথা,নতুন কোনো জিনিস দেখলে আগ্রহের সাথে অনেক প্রশ্ন করার কথা; সে বয়সে অর্ক কেন এত আলাদা – এই নিয়ে অর্কের বাবা-মা খানিকটা চিন্তিত ছিলেন। চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার পর তারা জানতে পারলেন অর্কের অটিজম রয়েছে।

 

অটিজম কী?

অটিজম হচ্ছে এক ধরনের জটিল স্নায়বিক বিকাশজনিত সমস্যা যা সামাজিক কার্যকলাপ,আচরণ,যোগাযোগ ও পারস্পারিক মিথস্ক্রিয়া বা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।

আমেরিকান চিকিৎসক লিও ক্যানার ১৯৪৩ সালে শিশুদের আচরণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে কিছু শিশুর মধ্যে আচরণগত বৈসাদৃশ্য লক্ষ্য করেন। অস্বাভাবিক আচরণকারী এ সকল শিশুদের রোগকে তিনি “অটিজম” হিসেবে আখ্যায়িত করেন। গ্রিক শব্দ ‘অটোস’ থেকে ‘অটিজম’ শব্দের উৎপত্তি। ‘অটোস’ শব্দের অর্থ ‘নিজ’। ‘অটিজম’-এ আক্রান্ত রোগী সব প্রকার সামাজিকতা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে আত্মকেন্দ্রিক হয় বলে এই রোগকে ‘অটিজম’ হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে।

অটিজম বা অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারের সাথে চারটি বিষয় জড়িত। এসপার্গার’স সিন্ড্রোম, অটিস্টিক ডিসঅর্ডার, চাইল্ডহুড ডিসইন্টিগ্রেটিভ ডিসঅর্ডার এবং এটিপিকাল অটিজম। এদের মধ্যে অটিস্টিক ডিসঅর্ডার সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হয় এবং অটিজম বলতে সাধারণত এটিকেই বোঝানো হয়।


অটিজমের কারণ

অটিজমের কোনো নির্দিষ্ট কারণ আজ অবধি জানা যায় নি। তবে ধারণা করা হয় জিনগত ও পরিবেশগত কারণে অটিজম হয়ে থাকে। মেয়ে শিশুর চেয়ে ছেলে শিশুর অটিজমে আক্রান্ত হওয়ার হার প্রায় ৪ গুণ বেশি। পরিবারে কারো স্নায়ুবিক বিকাশ জনিত সমস্যা বা অটিজম অথবা কোন মানসিক ও আচরণগত সমস্যা থাকলে, পরবর্তী সন্তানের ক্ষেত্রে অটিজম দেখা দিতে পারে। চিকিৎসকদের মতে গর্ভাবস্থায় ধূমপান,অ্যালকোহল ও কিছু বিশেষ ওষুধ সেবন করলে; অতিরিক্ত স্থূলতা বা ডায়বেটিস রোগে বা রুবেলায় আক্রান্ত হলে, শিশুর অটিজমে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।

অটিজমের লক্ষণসমূহ

সাধারণত মানব মস্তিষ্ক ৩ বছর বয়সের মধ্যে দৈনন্দিন কাজগুলোকে রুপ্ত করে ফেলে। অটিজম যেহেতু স্নায়বিক বিকাশজনিত সমস্যা, তাই এই বয়সেই একজন শিশুর অটিজমের লক্ষণগুলো ভালমতো প্রকাশ পায়। সাধারণত অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে নিমোক্ত লক্ষণসমূহ দেখা যায় :

  • সারাক্ষণ আনমনা থাকে বা আপন জগতে বিচরণ করে
  • দৈনন্দিন জীবনে কোন পরিবর্তন পছন্দ করে না
  • কারণে-অকারণে ক্ষিপ্ত হয়ে যায়
  • বিনা কারণে নিয়ত মেজাজ পাল্টাবে অত্যাধিক হাসি বা কান্নার মাধ্যমে
  • দেখা,শোনা,গন্ধ,স্বাদ অথবা স্পর্শের প্রতি অতি সংবেদনশীল অথবা প্রতিক্রিয়াহীন হয়
  • দেখিয়ে দেওয়া কিছুতে বেশি মনযোগী হয় না
  • কখনো কখনো ঘন্টার পর ঘন্টা নিজে থেকে অর্থহীন কাজে মগ্ন থাকে
  • ডাকলে সাড়া দেয় না, জিজ্ঞেস করলে নিজের নাম বলে না
  • চোখের দিকে সরাসরি তাকায় না
  • হাত পা অদ্ভুত ভাবে নাড়াতে বা প্যাঁচাতে থাকে
  • বারবার একই শব্দ বা অদ্ভুত শব্দ ও বাক্য মুখ দিয়ে করে
  • আপন কেউও আদর করে ধরতে গেলে বাধা দিতে চায়
  • নিজেকে বা অন্যকে অকারণে আঘাত করবে
  • বিপদ বুঝবে না এবং সাহায্য চাইবে না

 

এছাড়াও অটিস্টিক শিশুদের প্রতি চারজনে একজনের খিঁচুনি সমস্যা হতে পারে। এদের মানসিক অস্থিরতার ঝুঁকিও বেশী থাকে তাই বিষন্নতা, উদ্বিগ্নতা ও মনোযোগে ঘাটতিসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা যেতে পারে। অনেকের প্রায়ই হজমের অসুবিধা, পেট ব্যথা, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, পেটের গ্যাস, বমি ইত্যাদি হতে পারে।


অটিজমের চিকিৎসা

এটি বলে রাখা প্রয়োজন যে অটিজম সারিয়ে তোলার জন্য কোনো প্রকার কার্যকর চিকিৎসা এখনো পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। তবে যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে অটিজমে আক্রান্ত শিশুরা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে।

কোনো শিশু যদি ছয় মাস বয়সের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে না হাসে; নয় মাসের ভেতর তার পরিচিতজনের সঙ্গে কোনো প্রতিক্রিয়ামূলক আচরণ না করে; এক বছর বয়সে মুখে কোনো শব্দ না করে, আঙুল দিয়ে কোনো কিছু না দেখায়, কোনো অঙ্গভঙ্গি না করে; ১৬-১৮ মাস বয়সে একটি শব্দও না বলে; দুই বছরের ভেতর দুটি শব্দের বাক্য না বলে, অর্জিত সামাজিক বা যোগাযোগ দক্ষতা যদি হঠাৎ করে হারিয়ে ফেলে; তবে শিশুটি অটিজমে আক্রান্ত হতে পারে বলে ধারণা করা যায়। এমন অবস্থায় দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্র বা শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

উন্নত এবং উন্নয়নশীল অনেক দেশে অটিস্টিক শিশুদের প্রশিক্ষণের জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা আছে। বর্তমানে আমাদের দেশেও বেশকিছু প্রতিষ্ঠান এ ধরনের শিশুদের নিয়ে কাজ করছে। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর দায়িত্ব হলো দ্রুত শিশুটিকে এক পর্যায় থেকে অন্য পর্যায়ে উন্নত করার পথটি উন্মুক্ত করা। প্রশিক্ষণ নিতে হবে অভিভাবক এবং পরিবার-পরিজনদেরও। যোগাযোগ ও আচরণগত থেরাপি, অ্যাপ্লায়েড বিহেভিয়ারেল এনালাইসিস, অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ থেরাপি, সেনসরি ইন্টিগ্রেশন থেরাপি প্রভৃতির মাধ্যমে অটিজম ও এর জটিলতা কমানো সম্ভব।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল ইউনিভার্সিটির Institute for Paediatric Neurodisorder & Autism-এ এখন অটিজম আক্রান্ত শিশুদের উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিকাশকেন্দ্র, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট মাতুয়াইল, চট্টগ্রাম মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতাল, জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন, সিআরপি, সুইড-বাংলাদেশ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এবং ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক নিউরোডিস–অর্ডার অ্যান্ড অটিজম ইন চিলড্রেন এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে অভিভাবকদের প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা অটিজম শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রে অটিজমের সেবা মিলবে।

সর্বোপরি সচেতনতা ও শুরুতেই রোগ নির্ণয় সম্ভব হলে অটিজম সংক্রান্ত জটিলতা অনেকাংশে পরিহার করা সম্ভব।

leave your comment